মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬, ০৯:৪৩ পূর্বাহ্ন

 ৫ বছরেই কোটিপতি এসও’র ড্রাইভার!

 ৫ বছরেই কোটিপতি এসও’র ড্রাইভার!

নিজস্ব সংবাদদাতা : একটা লুুঙ্গি ছিঁড়ে গেলে আর একটা লুঙ্গি কেনার সামর্থ্য ছিল না শহিনুর মিয়ার। ৯বছর পূর্বে জীবিকা নির্বাহের জন্য ভাঙাচোরা একটি মোটরসাইকেল কেনে শহিনুর মিয়া। সেই মোটরসাইকেলে করে নেশাখোর মানুষদের নিয়ে যেতো শাল্লা ইউপির কুখ্যাত চোরের গ্রাম কামারগাঁও। কারণ সেখানে উৎপাদন হতো চোলাই মদ। অবশ্য প্রশাসনের কঠোর ভূমিকায় এখন আর চোলাইমদ উৎপাদন করে না কামারগাঁও গ্রামের মানুষ। সেসময় নেশাখোর মানুষদের মোটরসাইকেলে যাতায়াতের জন্য ভাড়া মিলত মাত্র ৩শ’ টাকা। কোনো কোনো সময় ৪শ’ টাকাও আয় রোজগার হতো শহিনুরের। এভাবেই দারিদ্রতার সাথে অনেকটা যুদ্ধ করে চলতো শহিনুরের সংসার।
শহিনুর মিয়া শাল্লা ইউপির ইছাকপুর গ্রামের ইসলাম নূরের ছেলে। শহিনুর মিয়া এখন কোটিপতি। এযেনো আলাদীনের চেরাগের গল্পের মতোই। ২০১৭ সালে সুনামগঞ্জ জেলার সবকটি হাওরের বোরোফসল ঠিকাদার ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের অবহেলায় ফসল তলিয়ে যাওয়ার পর ঠিকাদারি প্রথা বাতিল করে সরকার। প্রণয়ন করা হয় সংশোধিত কাবিটা নীতিমালা ২০১৭। নীতিমালা অনুযায়ী হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধের দায়িত্ব পান এলাকার স্থানীয় কৃষকরা।
 ২০১৭-২০১৮ অর্থ বছরে ১৮৩টি বাঁধের ভাঙা বন্ধকরণ ও মেরামতে বরাদ্দ দেয়া হয় ৩৪কোটি টাকা। বাঁধ নির্মাণের দায়িত্ব নিয়ে শাল্লায় অবস্থান করেন তৎকালীন পানি উন্নয়ন বোর্ডের শাখা কর্মকর্তা শমশের আলী মন্টু। এসও শমশের আলী মন্টু মোটরসাইকেল ড্রাইভার হিসেবে ব্যবহার করেন শহিনুরকে। মূলত তখন থেকেই ধীরেধীরে ভাগ্য বদল হতে থাকে তার।
২০১৮-২০১৯ অর্থ বছরই শহিনুরকে সোর্স হিসেবে ব্যবহার করা শুরু হয়। কৃষকদেরকে পিআইসি থেকে লাখ লাখ টাকা লাভবান হওয়ার লোভ দেখিয়ে প্রত্যেক পিআইসি কমিটির লোকজনদের নিকট থেকে অগ্রিম ১লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ ওঠে। বিনিময়ে বাঁধ মেরামতে প্রয়োজনের তুলনায় দেয়া হয় অতিরিক্ত বরাদ্দ। পিআইসি অনুমোদনের পূর্বে শহিনুর মিয়াকে কৃষকদের দিতে হয় ১৫হাজার থেকে ২০হাজার টাকা।
এমনই একটি ভিডিও এসেছে এপ্রতিবেদকের হাতে। এখানেই শেষ নয়, পিআইসি কমিটি বিল উত্তোলন করতেও শাখা কর্মকর্তাদের দিতে হয় ২০ভাগ কমিশন। পিআইসি কমিটির লোকজন বিল উত্তোলন করেন মোট ৪টি কিস্তিতে। বিল তুলতে গিয়েও পিআইসি কমিটি গায়ের ঘাম পায়ে ফেলতে হয়। ঘাটেঘাটে কৃষকদের দিতে হয় টাকা। এসব কথা পিআইসিরা রাস্তা-ঘাটে কিংবা চায়ের দোকানে বসে আলোচনা করলেও মিডিয়ার সামনে বলতে নারাজ তারা। এই কার্যক্রম চলতে থাকে ধারাবাহিকভাবে।
২০১৯-২০২০ অর্থ বছরে শাখা কর্মকর্তা শমশের আলী মন্টুর প্রমোশন হলে পাউবো’র শাল্লা শাখা কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পান আব্দুল কাইয়ুম। তখনও সিস্টেম একই, মোটরসাইকেল  ড্রাইভারও শহিনুর মিয়া। একেবারে অজপাড়া গ্রাম থেকে শাল্লা সদরের বাসিন্দা হয়ে যায় শহিনুর। সামান্য মোটরসাইকেল ড্রাইভার থেকে  হয়ে যায় কোটি টাকার মালিক। শাল্লা সদরের বাসিন্দা উজ্জ্বল মিয়ার দ্বিতীয় তলা ৬লাখ টাকায় বন্ধক রেখে শুরু করে বিলাসী জীবন।
এভাবেই পিআইসি কমিটির লোকজনদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিশেষ ব্যক্তি হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
এক পর্যায়ে পিআইসিররা শহিনুর মিয়াকে দ্বিতীয় এসও বলতে শোনা যায়! স্থানীয়দের ভাষ্যমতে গত ৫বছরে বিভিন্ন হাওরে প্রায় ৮হেক্টর বোরোজমি বন্ধক রেখেছে, আবার অনেক জমি কিনেও ফেলেছে। শাল্লা সদরে প্রায় ৪০লাখ টাকার একাধিক ভিটেমাটি বন্ধক রেখেছে। চড়াসুদে পিআইসিদের অগ্রিম টাকাও দেয়। এভাবেই দুর্নীতি ও প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করে আঙুল ফুলে কলাগাছ বনে গেছে। এতো অর্থের ঘটনা মিডিয়ায় জানাজানি হওয়ার আশঙ্কায় বছর খানেক আগে এসও’র ড্রাইভার দায়িত্ব থেকে কৌশলে অব্যাহতি দেন আব্দুল কাইয়ুম। পানি উন্নয়ন বোর্ডের মোটরসাইকেল ড্রাইভার হিসেবে ভাড়ার চালানোর দায়িত্ব হারালেও, এসও আব্দুল কাইয়ুমের সাথে রয়েছে তার নিবিড় যোগাযোগ।
জানা যায়, শহিনুর মিয়াকে মোটরসাইকেল ড্রাইভার হিসেবে প্রতি মাসে পাউবো’র শাখা অফিস থেকে দেয়া হতো ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। তাও তেল খরচ ড্রাইভারের। তাদেরকে মাসিক ভাড়ায় নেয়া হতো। জনমনে প্রশ্ন অন্যান্য মোটরসাইকেল ড্রাইভারদের যেখানে নূন আনতে পান্তা পুরোয়। সেখানে শহিনুরের মতো ড্রাইভার কোটিপতি হলো কী করে?
এবিষয়ে শাল্লা সদরের বাসিন্দা সোহাগ মিয়া বলেন শহিনুর তো পিআইসি নিয়া অনেক মারিং কাটিং করছে। আমার ছোট ভাই উজ্জ্বল মিয়ার বিল্ডিংয়ের দু’তলা বন্ধক নিছে ৬লাখ টাকায়। ঘুঙিয়ারগাঁও বাজারে অন্তত ৭টা ভিট বন্ধক আছে। এখানেই তো প্রায় ৪০লাখ টাকা। ফয়েজুল্লাহপুর গ্রামের জমি কিনছে ১২কেয়ার। ১৮লাখ টাকা দামের একটি ট্রাক্টরও আছে। সে কোটি টাকার মালিক এইডা সত্য। এখন আমারে কয় মামু পিআইসি দিমু কইয়া ধরা খাইয়ালাইছি। আমারে ২লাখ টাকা দেও। আমি কইছি তোমার তো সট হওয়ার কথা না। এখন তুমি যদি ইন্ডিয়া বা পাকিস্তানে টাকা পাঠাইয়া থাক, তাইলে হেইডা অন্য কথা। শহিনুর এর আগে কামারগাঁও নেশাখোরদের নিয়া যাইত মোটরসাইকেলে। দৈনিক ৩থেকে ৪ শ’ টাকা। আমি তখন হেইখানে হাঁস পালতাম। আমার হাঁসের খামার আছিল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইছাকপুর গ্রামের এক কৃষক বলেন ৪বছর আগে শহিনুরের একটা লুঙ্গি ছিঁড়লে আরেকটা লুঙ্গি কিনার সামর্থ্য আছিল না। গত বছর ২৫ কেয়ার জমি কিনছে। যার মূল্য প্রায় ২৫লাখ টাকা। ঘুঙ্গিয়ারগাঁও গ্রামের বাসিন্দা পলাশ সরকার পল্টু বলেন এবছর আমার ১২ শতাংশ জায়গা কিনছে শহিনুর ১৩লাখ টাকা দিয়া।
এব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ডের শাখা কর্মকর্তা আব্দুল কাইয়ুমের অফিসে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। মুঠোফোনে যোগাযোগ করলেও প্রতি বারের মতোই ফোন রিসিভ করেননি তিনি। সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের ২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী শামসুদ্দোহা বলেন কে সহিনুর? বাড়ি কেথায়? আমি তাকে চিনি না। তবে অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে জানান পানি উন্নয়ন বোর্ডের ওই কর্মকর্তা।

শেয়ার করুন

Comments are closed.




দৈনিক প্রতিদিনের কাগজ © All rights reserved © 2025 Protidiner Kagoj |